2024 সালের অক্ষয় তৃতীয়া কবে পড়েছে? জানুন অক্ষয় তৃতীয়ার ব্রতপালের নিয়ম ব্রতমাহাত্ম‍্য ও ব্রতকথা?

সনাতন শাস্ত্রে বছরের যে দিন গুলোকে সবচেয়ে পবিত্র বলে উল্লেখ রয়েছে তার মধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটি। বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের তৃতীয় তিথিতে পালন করা হয় এই অক্ষয় তৃতীয়া। অক্ষয় কথার অর্থ হল ক্ষয় নাই যার অথবা যা অবিনশ্বর। অর্থাৎ এই বিশেষ দিনে যা করা হয় সেই কাজ সারা জীবনের জন‍্য অক্ষয় হয়ে থাকে ব‍্যক্তির জীবনে। তাই সনাতন সাহিত্যে এই দিনটির বিশেষ মাহত্ম‍্য বর্নণা করা হয়েছে। আজ আপনারা আমাদের এই লেখায় অক্ষয় তৃতীয়ার মহাত্ম‍্য এবং ইংরেজির 2024 সালের তথা বাংলা ১৪৩১ সালের পঞ্জিকার তারিখ ও সময়সূচী জানতে পারবেন। সঙ্গে জানবেন কিভাবে এই ব্রত পালন করবেন, ব্রতপালনের নিয়ম বিধি এবং অক্ষয় তৃতীয়ার ব্রতকথা।


শুধু হিন্দু শাস্ত্রে নয় জৈন শাস্ত্রেও এর মাহাত্ম্য বিশদে বর্নণা করা রয়েছে। হিন্দু কিংবদন্তি অনুসারে একটি দুটি কারনে নয়। একসঙ্গে অনেক গুলো ঘটনা এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ঘটেছিল। অর্থাৎ এই দিনটির মাহাত্ম্য বর্নণা করতে গেলে অনেক গুলো পৌরাণিক ঘটনা আপনাদের সামনে বলতে হয়। যেমন :

১) অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ভগবান বিষ্ণু তার ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম রুপে এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই দিনটিতে অনেক অংশে পরশুরাম জয়ন্তী রুপে পালন করা হয়।

২) এই দিনেই মহর্ষি বেদব‍্যাসের মুখনিঃসৃত বাণী থেকে মহাভারত লেখা শুরু করেন প্রজাপতি গণেশ।

৩) অক্ষয় তৃতীয়ার এই মহা পবিত্র দিনেই সত‍্য যুগের অবসান হয়ে ত্রেতা যুগের শুরু হয়।

৪) রাজা ভগীরথ কঠোর তপস‍্যার দ্বারা মা গঙ্গাকে মর্ত‍্যে নিয়ে আসেন এই দিনেই।

৫) এই দিনে আবার রাবণ ভ্রাতা কুবেরর তপস‍্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব তাকে অসীম ধন ও ঐশ্বর্য প্রদান করেন। এদিন কুবেরের লক্ষ্মী লাভ হয়েছিল বলে এদিন বৈভব লক্ষ্মীর পুজো করা হয়।

৬ ) অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই মা অন্নপূর্ণার আবির্ভাব হয়েছিল।

৭) ছয় মাস পর চার ধামের দরজা খোলা হয় এই বিশেষ দিনেই।

৮) এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই হস্তিনাপুরের রাজ সভায় দুর্যোধন দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের চেষ্টা করে।

৯ ) বন্ধু সুদামার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের প্রথম দেখা হয় এই দিনেই। ভগবান এক মুঠো চালের বিনিময়ে সুদামার সব দুঃখ হরণ করেন।

১০ ) অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকেই পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার রথের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

১১) মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে অক্ষয় তৃতীয়ার এই তিথিতেই যুধিষ্ঠিরকে অক্ষয় পাত্র দান করেন ভগবান কৃষ্ণ।

2024 সালের অক্ষয় তৃতীয়ার তারিখ :
10 মে শুক্রবার।

অক্ষয় তৃতীয়ার বাংলা তারিখ :
২৬ বৈশাখ।

◆ তৃতীয়া তিথি শুরু – 04:17 AM 10 মে, 2024.
◆ তৃতীয়া তিথি শেষ – 02:50 AM 11 মে, 2024.
◆ অক্ষয় তৃতীয়া পূজা মুহুর্ত – 04:59 AM থেকে 11:33 AM

ব্রতের দ্রব‍্য : নতুন কাপড়, কলসী, যব, ভুজ্জি, তালপাতার পাখা এবং গামছা।

ব্রতের নিয়ম : যব দ্বারা লক্ষ্মী-নারায়ণ পূজা করবেন হয় এবং তারপর ভুজ্জি, জলভরা কলসী, তালপাতার পাখা,গামছা বা নতুন কাপড় ব্রাহ্মণকে প্রদান করতে হয়।

ব্রতের ফল : এই ব্রত পালন করলে সর্ব সুখ লাভ করা যায় এবং ভক্ত মৃত্যুর পর বৈকুন্ঠ ধাম যাত্রা করে।

একবার ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শতানিক মুনির কাছে অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য কথা শুনতে চাইলেন । যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে শতানিক মুনি এবং  অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য কথা বর্নণা করেন।

অনেকদিন আগে এক স্থানে এক নিষ্ঠুর ও অধার্মিক ব্রাহ্মণ তার স্ত্রীর সঙ্গে বাস করতেন। ব্রাহ্মণ কোনোদিন কাউকে সাহায্যতো করেই নি বরং তার কাছে কেউ সাহায্যের জন্য আসলে সে তার সঙ্গে সাহায্য করবার পরিবর্তে খারাপ ব‍্যবহার করে তাড়িয়ে দিত। তার স্ত্রীর এর নাম ছিলো সুশীলা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর স্ত্রী সুশীলা ছিলো অত্যন্ত ধর্মপ্রাণা একজন মহিলা। একদিন এক ঘটনা ঘটলো। একবার এক পথিক ব্রাহ্মণ অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে কোন উপায় না পেয়ে এই ব্রাহ্মণ পরিবারে আসে কিছু আহারের আশায়। কিন্তু  নিষ্ঠুর ব্রাহ্মণ তাকে খাবার দুরের কথা এক ফোঁটা জলও পথিককে দিতে চায়নি। তাকে কটূ কথা বলে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিল। পথিক ব্রাহ্মণ যখন অত্যন্ত কষ্ট নিয়ে সেখান থেকে ফিরছিল এমন সময় সুশীলা এসে সেই পথিক ব্রাহ্মণের পথ আটকে বলে তিনি যেন সেখান থেকে চলে না যান। কারণ তিনি তার পরিবারের একজন অতিথি। আর অতিথি র সেবা করাই তাদের ধর্ম। এরপর সুশীলা তার স্বামীর দুর্ব‍্যবহারের তাকে জন‍্য কড়া ভাষায় ভৎসনা করে এবং তার স্বামীর খারাপ ব্যবহারের জন্য সে সেই পথিক ব্রাহ্মণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারপর সুশীলা তার বাড়ীর ভিতর থেকে একমুঠো অন্ন ও জল এনে পথিক ব্রাহ্মণকে দেয় । বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের তৃতীয়া তিথিতে ক্ষুধার্তকে এই অন্নজল দানে তার পুন্যির ভাণ্ডার ভরে ওঠে ও এই দান অক্ষয় হয়ে থাকে।

এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর সুশীলার স্বামী অর্থাৎ সেই অধার্মিক ব্রাহ্মণের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর যমদূতরা আসে এবং তাকে যমালয়ে নিয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই তার তার বিচার হয় এবং তার সারা জীবনের কুকর্মের জন‍্য তাকে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। নরকে তার পাপের শাস্তি প্রদানের জন‍্য যখন তার ওপর অকথ্য অত্যাচার চালায় সেই সময় ব্রাহ্মণ জল তেস্টায় কাতর হয়ে ওঠে। কিন্তু যমদূতরা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে সেও একবার এক ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত ব্রাহ্মণ অতিথিকে জলদান করতে অস্বীকার করেছিলো। সেই মহাপাপের কারনেই তাকে এখন কোনভাবেই জল প্রদানকরা হবে না। অত্যাচারের পর কোন প্রকার জল না দিয়েই তৃষ্ণার্ত ব্রাহ্মণকে যমদূতরা যমরাজের কাছে নিয়ে এল। তখন যমরাজ সবদিক বিচার করে ব্রাহ্মণকে নরক থেকে মুক্তি দিতে বললেন। এ প্রসঙ্গে যমরাজ বললেন তার সৎ ও ধার্মিক স্ত্রী সুশীলা ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত সেই ব্রাহ্মণ অতিথিকে বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের তৃতীয়া তিথিতে ব্রাহ্মণ অতিথিকে অন্ন-জল দান করেছিল। এই তিথিতে সে অন্ন ও জল দান করে যে পুণ্য সঞ্চয় করেছিলো সেই পুণ্যের কারণেই এই ব্রাহ্মণকে মুক্তি দেওয়া হল। সে তার পত্নীর পুন্যির কারণে মুক্তি পেল। বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়াতে যে অতিথিকে অন্ন ও জল দান করে তার মৃত্যুর পর বৈকুণ্ঠধাম লাভ হয়। যমরাজের আদেশের পর যমদূতরা ব্রাহ্মণকে মুক্তি  দেয়।

এই দিন আপনারা যা করবেন তাই আপনার জীবনে অক্ষয় হয়ে থাকবে। তাই এই বিশেষ দিনে আপনারা কোন শুভ কাজ শুরু করতে পারেন। এই বিশেষ দিনে আপনি যে কাজ শুরু করবেন সেই কাজে নিশ্চিতরূপে সফলতা পাবেন। এই দিনে অবশ্যই কোন দরিদ্র ব‍্যক্তিকে দান ধ‍্যান করবেন।আজকের দান আপনাকে সারা জীবন ফল প্রদান করবে।  যদি সম্ভব হয় এই দিনে গঙ্গা স্নান করবেন। শাস্ত্রে বলা রয়েছে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে স্নান, ধ্যান, জপ-তপ, যজ্ঞ, পিতৃ তর্পণ করলে মহাপুণ্য অর্জিত হয় এবং এই পুন‍্য ফল পরিবার সারাজীবন ভোগ করে।

আবার এই দিন কিছু কিছু কাজে বারন করা রয়েছে। এদিন কারো সঙ্গে ঝগড়া অশান্তি করবেন না। কারো ক্ষতি করবেন না। আপনার কাছে সাহায্য চাইতে আসা কাউকে খালি হাতে ফেরাবেন না। আমিষ আহার এবং নেশা জাতীয় দ্রব‍্য বর্জন করুন এই বিশেষ দিনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *